শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের নজির গড়ল শিলিগুড়ির নেওটিয়া গেটওয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ইতিমধ্যেই সেখানে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ৫৭টি কিডনি প্রতিস্থাপন। এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও উন্নতমানের রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে হাসপাতালটি।
শুক্রবার হাসপাতালের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কথা তুলে ধরেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
সমন্বিত চিকিৎসা পরিষেবাতেই সাফল্য
সাংবাদিক সম্মেলনে নেফ্রোলজির লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ অজিত কুমার সিং (এমডি, ডিএনবি) প্রতিটি কিডনি প্রতিস্থাপনের পিছনে থাকা সমন্বিত চিকিৎসা-পরিচর্যা ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি জানান, হাসপাতালের কিডনি প্রতিস্থাপন কর্মসূচিতে নেফ্রোলজি, ইউরোলজি, অ্যানেস্থেসিওলজি এবং কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় রয়েছে। দাতা ও গ্রহীতার প্রাথমিক মূল্যায়ন থেকে শুরু করে প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার, ক্রিটিক্যাল কেয়ার এবং দীর্ঘমেয়াদি পোস্ট-ট্রান্সপ্লান্ট ফলো-আপ—সমস্ত ক্ষেত্রেই একটি সুসংগঠিত চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এক ছাদের নিচেই সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা
ডাঃ অজিত কুমার সিং আরও বলেন, একই ছাদের নিচে রোগীদের ধারাবাহিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই অঞ্চলে নিরাপদ ও কার্যকর রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট কর্মসূচি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় একাধিক বিভাগের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে পরিকল্পিত চিকিৎসা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে।
এবার আর দূরবর্তী মহানগরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই
ইউরোলজির লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ অভিষেক কুমার সিং (এমএস, ডিএনবি) এই সাফল্যের আঞ্চলিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের রোগীদের জটিল কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য এখন আর দূরবর্তী মহানগরগুলিতে ছুটতে হবে না।
উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা শিলিগুড়িতেই পাওয়া যাওয়ায় রোগী এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের চাপও অনেকটাই কমেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সময়মতো চিকিৎসা ও পরামর্শের উপর জোর
নেফ্রোলজির লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ সুতানয় ভট্টাচার্য (এমবিবিএস, এমডি, ডিএম) ক্রনিক কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, কিডনি রোগীদের সঠিক সময়ে নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুপরিকল্পিত ট্রান্সপ্লান্ট ওয়ার্ক-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর জন্য সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইউরোলজির লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ কিশোর রায়, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারির লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ রাজীব ত্রেহান, অ্যানেস্থেসিওলজির লিড কনসালট্যান্ট ও এইচওডি ডাঃ ইকবাল রহমান এবং অ্যানেস্থেসিয়ার লিড কনসালট্যান্ট ডাঃ রোহিত ধানুকা।
উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় নতুন মাইলফলক
হাসপাতালের ফ্যাসিলিটি ডিরেক্টর ডাঃ সঞ্জীব সরকার বলেন, গত কয়েক বছরে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নয়নের ফলে রোগীদের আরও উন্নত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, ৫৭টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন শুধু একটি সংখ্যাগত সাফল্য নয়, এটি উত্তরবঙ্গের উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর কথায়, উচ্চমানের উন্নত কিডনি চিকিৎসা এখন বাড়ির কাছেই পাওয়া সম্ভব।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, রোগীদের মূল্যায়ন থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার এবং আজীবন ফলো-আপ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর ক্লিনিক্যাল মান বজায় রাখা হচ্ছে। এই সাফল্যের ফলে উত্তরবঙ্গের কিডনি রোগী ও তাঁদের পরিবারের চিকিৎসা সংক্রান্ত দীর্ঘ যাত্রার চাপ কমার পাশাপাশি শিলিগুড়িতে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার নতুন দিগন্ত খুলে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।