শিলিগুড়ি (নিজস্ব সংবাদদাতা): ফরাক্কা স্টেশনের কাছে আচমকা রেললাইন ধসে পড়ার ঘটনায় উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে রেল যোগাযোগ কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একের পর এক দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল হওয়ায় শুক্রবার সকাল থেকেই নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় ও দুর্ভোগ চরমে ওঠে। ট্রেন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় বহু যাত্রী বাধ্য হয়ে সড়কপথে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।
বাতিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন
ফরাক্কার ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন বাতিল করা হয়। এনজেপি থেকে হাওড়াগামী শতাব্দী এক্সপ্রেসের সময় প্রথমে পরিবর্তন করা হলেও পরে সেটিও বাতিলের ঘোষণা করা হয়। এরপর বন্দে ভারত, বন্দে ভারত স্লিপার, দার্জিলিং মেল, পদাতিক এক্সপ্রেস, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, সরাইঘাট এক্সপ্রেস, কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, গৌড় এক্সপ্রেস, কামরূপ এক্সপ্রেস, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস, কুলিক এক্সপ্রেস এবং অমৃত ভারত এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়।
ফলে স্টেশনে আটকে পড়েন বহু যাত্রী। অনেকেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিকল্প পরিবহণের সন্ধান শুরু করেন।
সরকারি বাসের টিকিট শেষ, বাড়ল যাত্রীচাপ
রেল পরিষেবা বন্ধ থাকায় সড়কপথে যাত্রীদের চাপ আচমকাই বেড়ে যায়। শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসে সরকারি বাসের অগ্রিম টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যায়। সাধারণ দিনে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার উদ্দেশে সীমিত সংখ্যক সরকারি বাস চলাচল করায় অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামলাতে কার্যত হিমশিম খেতে হয় পরিবহণ কর্তৃপক্ষকে।
সরকারি বাসে আসন না পেয়ে বহু যাত্রী বেসরকারি বাসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। এরই মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। ফলে একদিকে ট্রেন বাতিলের দুর্ভোগ, অন্যদিকে বাসের টিকিটের জন্য হাহাকার—দুইয়ের জেরে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
দুর্ভোগ কমাতে নামানো হল ৪০টি অতিরিক্ত বাস
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজ্য সরকার দ্রুত এনবিএসটিসির ৪০টি অতিরিক্ত বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাস থেকে পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও রাজ্য মন্ত্রী আনন্দময় বর্মন ওই বাসগুলির যাত্রার সূচনা করেন। অতিরিক্ত বাসগুলির মধ্যে পাঁচটি ভলভো বাসও রয়েছে।
পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, “সরকার সংকটের পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে রয়েছে।” যাত্রীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে বলেও তিনি জানান।
রাজ্য মন্ত্রী আনন্দময় বর্মন বলেন, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতেই দ্রুত এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত বাস চলাচলের ফলে আটকে পড়া যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছতে কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প পথের সন্ধানে যাত্রীরা
ট্রেন বাতিলের জেরে যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ দেখা যায়। কলকাতার বাসিন্দা রিন্টু ঘোষ জানান, তিনি ভোর পাঁচটার ট্রেন ধরতে এনজেপিতে পৌঁছেছিলেন। প্রথমে ট্রেনের সময় দুপুর তিনটে পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরে আচমকা ট্রেন বাতিলের ঘোষণা করা হলে বাধ্য হয়ে বিমানে কলকাতা ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।
বর্ধমানের যাত্রী রাহুল দাস এবং দীঘাগামী পিঙ্কু নন্দীকেও ট্রেন বাতিলের পর বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হয়। বাস কাউন্টারে ‘ফুল’ লেখা বোর্ড দেখে তাঁদের বেসরকারি বাসের উপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে, তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেসের যাত্রী রতন পাল থার্ড এসির টিকিট থাকা সত্ত্বেও অনিশ্চয়তার কারণে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফরাক্কার রেললাইন ধসের জেরে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে যাত্রী থেকে শুরু করে পরিবহণ মহল।