শিলিগুড়ি: উচ্চমাধ্যমিকের পর কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে? কোন কোর্সে ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে? কীভাবে সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা উচিত? এমনই একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শনিবার শিলিগুড়িতে ভিড় জমালেন শত শত পড়ুয়া ও তাঁদের অভিভাবকেরা। আর সেই মঞ্চ থেকেই উঠে এল এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—বাংলার মেধা আর ভিন রাজ্যে নয়, নিজেদের রাজ্যের উন্নয়নেই কাজে লাগুক।
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রফেশনাল অ্যাকাডেমিক ইনস্টিটিউশনস (APAI), পশ্চিমবঙ্গের উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রি-কাউন্সেলিং অ্যান্ড এডুকেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা, শিল্প এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বার্তা দেন শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। উত্তরবঙ্গের পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করাই ছিল এই মেলার মূল লক্ষ্য।
এক ছাদের নিচে ৫০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
এই শিক্ষা মেলায় রাজ্যের ৫০টিরও বেশি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, ম্যানেজমেন্ট, মেরিন ও পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিজেদের কোর্স, ভর্তি প্রক্রিয়া, স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
পড়ুয়া ও অভিভাবকেরা সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পান। ফলে শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, উচ্চশিক্ষা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘এখানেই পড়বে, এখানেই কাজ করবে’—সত্যম রায় চৌধুরী
APAI-এর সাধারণ সম্পাদক তথা সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি, কলকাতা এবং টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি, ত্রিপুরার আচার্য ও টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সত্যম রায় চৌধুরী বলেন, “এখানেই পড়বে, এখানেই চাকরি করবে—এই পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, একসময় বাংলার বহু পড়ুয়াকে ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য পেশাগত শিক্ষার জন্য ভিন রাজ্যে যেতে হত। কারণ সেই সময় রাজ্যে পর্যাপ্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু ১৯৯৭-৯৯ সালের পর থেকে পরিস্থিতির বদল ঘটতে শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বহু আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং পড়াশোনার জন্য রাজ্যের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
তিনি আরও বলেন, “বাংলার ছেলেমেয়েদের মেধার কোনও অভাব নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন বড় সংস্থায় বাংলার পড়ুয়ারা নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য সেই মেধাকে বাংলার উন্নয়নের কাজে লাগানো।”
শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উপর জোর
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদীয় বিষয়ক ও পর্যটন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. শঙ্কর ঘোষ। তিনি বলেন, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ালেই হবে না, তার সঙ্গে সমানভাবে প্রয়োজন শিল্পবান্ধব পরিবেশ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
তাঁর কথায়, “রাজনীতি নয়, উন্নয়নই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা রাজ্যেই পড়াশোনা করে এখানেই সম্মানজনক কাজের সুযোগ পায়।”
মন্ত্রী আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যদি নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ আসে, তাহলে তার সুফল শুধু শিক্ষিত যুব সমাজ নয়, গোটা রাজ্যের অর্থনীতির উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চাকরি নয়, দক্ষতা ও আগ্রহকেও গুরুত্ব
সত্যম রায় চৌধুরী পড়ুয়াদের উদ্দেশে বলেন, জীবনে সফল হতে শুধুমাত্র চাকরির কথা ভাবলে হবে না। নিজের আগ্রহ, দক্ষতা এবং যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয় নির্বাচন করতে হবে। সঠিক কাউন্সেলিং এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ পেলে প্রত্যেক পড়ুয়াই নিজের পছন্দের ক্ষেত্রে সফল হতে পারে।
তাঁর মতে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো রয়েছে। এখন দরকার সেই সুযোগগুলিকে আরও শক্তিশালী করা এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার আরও নিবিড় সংযোগ তৈরি করা।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই মূল উদ্দেশ্য
আয়োজকদের বক্তব্য, এই শিক্ষা মেলার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিভিন্ন কলেজে ভর্তি করানো নয়। বরং পড়ুয়া এবং তাঁদের অভিভাবকদের সামনে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
মেলায় বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়ে উপকৃত হন উপস্থিত পড়ুয়া ও অভিভাবকেরা।
MAKAUT ও জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের সহযোগিতা
এই শিক্ষা মেলা অনুষ্ঠিত হয় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (MAKAUT), পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশন বোর্ড এবং রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের সহযোগিতায়।
APAI-এর দাবি, বর্তমানে তাদের অধীনে রাজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ৯৫ শতাংশ ফার্মেসি আসনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশিষ্টদের উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন APAI-এর সাধারণ সম্পাদক সত্যম রায় চৌধুরী, সংসদীয় বিষয়ক ও পর্যটন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. শঙ্কর ঘোষ, আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর সরিৎ কুমার চৌধুরী, শীতলকুচির বিধায়িকা সাবিত্রী বর্মণ, জেআইএস গ্রুপের ডেপুটি ডিরেক্টর বিদ্যুৎ মজুমদার, ড. বি. সি. রায় কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেয়ারম্যান তরুণ ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কো-কনভেনর সুজয় বিশ্বাস, বিজেপি শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলার সম্পাদিকা মৌসুমী মুখার্জী বাগচী, শিলিগুড়ি পুরনিগমের প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র নান্টু পাল-সহ শিক্ষা জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
এই শিক্ষা মেলা শুধু উচ্চশিক্ষার তথ্য জানার একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং বাংলার পড়ুয়াদের রাজ্যের মধ্যেই উন্নত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখানোর এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই উঠে এসেছে।