শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল ও জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং উন্নয়নমূলক কাজের আইনি জটিলতা দূর করতে বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। জঙ্গলের সীমানা থেকে নির্ধারিত ইকো সেনসিটিভ জোন (ESZ)-এর পরিধি ৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ১ কিলোমিটার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাঁও।
বুধবার শিলিগুড়ি স্টেট গেস্ট হাউসে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বনমন্ত্রী এই ঘোষণা করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, পরিবহণ ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন, শিলিগুড়ির বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায় এবং বন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা।
দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে বড় সিদ্ধান্ত
বনমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় ও সমতলের বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা ইকো সেনসিটিভ জোনের কঠোর নিয়ম শিথিল করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী ৫ কিলোমিটারের বাফার জোনের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প, রাস্তা, সেতু এবং পরিকাঠামো নির্মাণে একাধিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছিল। সেই সমস্যার সমাধান করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য একদিকে যেমন মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করা, তেমনই অন্যদিকে বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণেও কোনওরকম আপস না করা।
শীঘ্রই প্রকাশ হবে খসড়া বিজ্ঞপ্তি
বনমন্ত্রী আরও জানান, খুব শীঘ্রই এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি (ড্রাফ্ট নোটিফিকেশন) প্রকাশ করা হবে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন নিয়ম কার্যকর করা হবে।
অরণ্য সপ্তাহে ৭ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, আসন্ন অরণ্য সপ্তাহ উপলক্ষে সারা রাজ্যে বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য বাড়িয়ে ৭ কোটি চারা গাছ রোপণ করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়ন বাড়াতে এই কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
পরিবেশবিদদের উদ্বেগ
যদিও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে, তবুও পরিবেশবিদদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন (HNAF)-এর মুখপাত্র অনিমেষ বসু বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে ইকো সেনসিটিভ জোনের পরিধি কমানো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে, তবে বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণের করিডর এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলির সুরক্ষায় কোনওভাবেই যেন ছাড় না দেওয়া হয়। বন দফতরকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বনমন্ত্রীর আশ্বাস
পরিবেশবিদদের উদ্বেগের জবাবে বনমন্ত্রী মনোজ ওরাঁও বলেন, নতুন নীতির চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির সময় বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের প্রতিটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। যেখানে পূর্ববর্তী নিয়মে অসঙ্গতি ছিল, সেগুলি সংশোধন করা হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য বজায় রেখে সরকার এগোবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে উত্তরবঙ্গের বনসংলগ্ন এলাকায় বহুদিন ধরে আটকে থাকা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের গতি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও প্রশাসনের উপর বাড়তি দায়িত্ব থাকবে বলে মত বিশেষজ্ঞ মহলের।