ড্রাগন ফলের পর এবার অ্যাভোকাডো চাষে নজর উত্তরবঙ্গের
বিদেশি ফলের চাষে কৃষকদের সামনে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা
শিলিগুড়ি, ১৭ সেপ্টেম্বর: উত্তরবঙ্গের কৃষিতে নতুন নতুন ফলের চাষকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনা। ড্রাগন ফ্রুটের পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে অ্যাভোকাডো। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় ‘হাস’ জাতের অ্যাভোকাডো চাষ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে কৃষক ও কৃষি-উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিদেশ থেকে উন্নতমানের চারা এনে উত্তরবঙ্গের মাটি ও আবহাওয়ায় এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ কতটা সফল হতে পারে, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোফার্ম।
স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের বাড়তে থাকা চাহিদা
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অ্যাভোকাডোর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন খাবার, সালাদ এবং স্বাস্থ্যকর ডায়েটে এই ফলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের বাজারে অ্যাভোকাডোর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উন্নতমানের ফল উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকার জলবায়ু ও জমির বৈশিষ্ট্য অ্যাভোকাডো চাষের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারে।
তাপমাত্রা, মাটি ও জলনিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
অ্যাভোকাডো চাষের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা, মাটির গুণমান এবং জলনিকাশ—এই তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং তুষারমুক্ত পরিবেশ এই ফলের বৃদ্ধির জন্য অনুকূল। জমিতে যাতে জল দীর্ঘ সময় জমে না থাকে, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হয়।
ঝুরঝুরে ও ভালো জলনিকাশযুক্ত মাটিতে, প্রায় ৬ থেকে ৭ পিএইচ মাত্রায় অ্যাভোকাডো গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। নিয়মিত সেচের জন্য ফোঁটা সেচ বা ড্রিপ ইরিগেশন ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
উন্নত চারায় ফলনের সম্ভাবনা বাড়বে
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নতমানের কলম করা চারা ব্যবহার করলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত ৫ থেকে ৭ মিটার দূরত্বে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী এক একর জমিতে প্রায় ১১২টি গাছ বসানো সম্ভব।
তবে শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না। গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জৈব সার, কম্পোস্ট এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক সেচ এবং রোগ-পোকার নিয়ন্ত্রণই বাগানের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
তিন-চার বছরেই ফলন, পূর্ণ উৎপাদনে আরও সময়
অ্যাভোকাডো গাছে সাধারণত তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ফলন শুরু হতে পারে। তবে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছতে আরও কয়েক বছর সময় লাগে। ভালোভাবে পরিচর্যা করা পরিণত গাছ থেকে বছরে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাগান তৈরি করতে পারলে অ্যাভোকাডো কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক ফসল হয়ে উঠতে পারে। একটি পরিণত গাছ থেকে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলের তরফে জানানো হয়েছে।
‘হাস’ জাতকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহ
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোফার্মের অধ্যাপক অমরেন্দ্র পান্ডে জানান, ‘হাস’ অ্যাভোকাডো মূলত মেক্সিকান ও গুয়াতেমালান অ্যাভোকাডোর সংকর জাত। আন্তর্জাতিক বাজারে এই জাতের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। অনেকের কাছে এটি ‘বাটার ফ্রুট’ নামেও পরিচিত।
অধ্যাপক পান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, কেরালা, তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে অ্যাভোকাডো চাষ হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের লাভা, লোলেগাঁও ও কালিম্পং এবং ভুটানের কিছু এলাকাতেও এই ফল চাষের নজির রয়েছে।
আমদানিনির্ভর বাজারে স্থানীয় উৎপাদনের সুযোগ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের অ্যাভোকাডো বাজারের বড় অংশ এখনও আমদানিনির্ভর। বিদেশ থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফল আসার কারণে পরিবহণের সময় গুণমান ও সতেজতা ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই জায়গায় উত্তরবঙ্গে উন্নতমানের অ্যাভোকাডো উৎপাদন করা গেলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সাধারণ মানের অ্যাভোকাডো অনেক সময় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। তবে উন্নতমানের ‘হাস’ জাতের অ্যাভোকাডোর বাজারে আলাদা চাহিদা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম ওজনের এই ফলের ডিম্বাকৃতি গঠন এবং মসৃণ, মাখনের মতো শাঁস এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণেও উদ্যোগ
অ্যাভোকাডো চাষকে শুধু পরীক্ষামূলক পর্যায়ে না রেখে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে কোফার্মের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর ফলে নতুন কৃষি-উদ্যোক্তারাও এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
অ্যাভোকাডোর সম্ভাবনা নিয়ে এর আগে ‘মন কি বাত’-এও আলোচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশে এই ফলের বাড়তে থাকা চাহিদা এবং কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগের বিষয়টি সেখানে উঠে এসেছিল।
এখন উত্তরবঙ্গের মাটিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অ্যাভোকাডো চাষ কতটা সফল হয়, সেটাই দেখার। সঠিক জাতের চারা, উপযুক্ত জমি, নিয়ন্ত্রিত সেচ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ—এই কয়েকটি বিষয়ের উপরই নির্ভর করছে উত্তরবঙ্গে অ্যাভোকাডো চাষের ভবিষ্যৎ।